Home আন্তর্জাতিক কেনো ভ্লাদিমির পুতিন ইতোমধ্যে যুদ্ধে হেরে গেছেন

কেনো ভ্লাদিমির পুতিন ইতোমধ্যে যুদ্ধে হেরে গেছেন

120
0

এক সপ্তাহেরও কম সময়ের যুদ্ধের পর মনে হচ্ছে ভ্লাদিমির পুতিন একটি ঐতিহাসিক পরাজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সব খণ্ডযুদ্ধে হয়ত তিনি জিতবেন, কিন্তু আসল যুদ্ধেই হেরে যাবেন। পুতিন রুশ সাম্রাজ্য পুনর্নিমাণের যে স্বপ্ন দেখছেন সেটি একটি মিথ্যা ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে; আর তা হলো- ইউক্রেন কোনো জাতি নয়, ইউক্রেনীয়রা কোনো সত্যিকার জনগোষ্ঠী নয় এবং কিয়েভ, খারকিভ, লভিভের বাসিন্দারা মস্কোর শাসনের জন্য উৎসুক হয়ে আছে। এটি ডাহা মিথ্যা। ইউক্রেন হাজার বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাস সমৃদ্ধ জাতি। মস্কো যখন গ্রামও হয়ে ওঠেনি তখনই কিয়েভ একটি গুরুত্বপূর্ণ নগর হয়ে উঠেছিল। কিন্তু রুশ স্বৈরশাসক মিথ্যাগুলো এতবার বলেছেন যে তিনি নিজেই এসব বিশ্বাস করছেন বলে মনে হচ্ছে।

ইউক্রেনে হামলার পরিকল্পনার সময়ে পুতিন অনেক জ্ঞাত তথ্যের ওপর নির্ভর করে থাকতে পারেন। তার জানা ছিল, সামরিকভাবে রাশিয়া ইউক্রেনের তুলনায় দৈত্যকায় । তার এও জানা ছিল, ইউক্রেনের সাহায্যে ন্যাটো সৈন্য পাঠাবে না। তার এটিও জানা ছিল, রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর ইউরোপীয় নির্ভরশীলতার কারণে জার্মানির মতো দেশগুলোকে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিতে দোটানায় পড়বে। এই জানা বিষয়গুলোর ভিত্তিতে তার পরিকল্পনা ছিল ইউক্রেনে ঝটিতি প্রবল হামলা এবং দেশটির সরকারকে হটিয়ে সেখানে একটি পুতুল সরকার বসিয়ে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার গ্যাঁড়াকল থেকে বের হয়ে আসা।

কিন্তু একটি বড় অজানা বিষয় এই পরিকল্পনার বাইরে থেকে গেছে। তা আমেরিকানরা ইরাকে আর সোভিয়েতরা আফগানিস্তানে শিখেছে: একটি দেশ দখল করা যতটা সহজ সেই দখল ধরে রাখা ততটা সহজ নয়। পুতিন জানেন ইউক্রেন দখল করার শক্তি তার রয়েছে। কিন্তু ইউক্রেনের মানুষ কি মস্কোর পুতুল সরকারকে মেনে নেবে? পুতিন বাজি ধরে বলেছেন যে ইউক্রেনের মানুষ মানবে। সর্বোপরি, তিনি শুনতে রাজি যে কাউকে একথা বরাবারই বলে যাচ্ছেন যে ইউক্রেন কোনো আলাদা জাতি নয়, ইউক্রেনীয়রা কোনো সত্যিকার জনগোষ্ঠীও নয়। ২০১৪ সালে ক্রাইমিয়া রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি বলা চলে। ২০২২ সাল আলাদা হতে যাবে কেনো?

দিন যতো যাচ্ছে ততই পরিষ্কার হচ্ছে যে, পুতিন বাজিতে হেরে যাচ্ছেন। ইউক্রেনের মানুষ সর্বান্তকরণে প্রতিরোধ করছে, তারা সারা বিশ্বের প্রশংসা কুড়াচ্ছে এবং যুদ্ধে জিতছে। সামনে অনেক অন্ধকার দিন অপেক্ষা করছে। ইউক্রেনের পুরোটা দখল করে নিলেও যুদ্ধে জিততে হলে রাশিয়াকে ইউক্রেনের দখল ধরে রাখতে হবে। আর তারা এটি পারবে ইউক্রেনের মানুষ আদৌ তা করতে দিলে। তবে তা ঘটা ক্রমেই অসম্ভব বলে প্রতিভাত হচ্ছে।

রাশিয়ান ট্যাংক ধ্বংসের প্রতিটি ঘটনা এবং প্রতিটি রুশ সেনার মৃত্যু ইউক্রেনীয়দের প্রতিরোধের সাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইউক্রেনীয়দের প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনা হামলাকারীদের প্রতি ইউক্রেনের মানুষের ঘৃণাকে আরও তীব্র করছে। ঘৃণা মানুষের আবেগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কুৎসিত। কিন্তু নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠীর জন্য ঘৃণা গুপ্তধন। হৃদয়ের গভীরে সুপ্ত থেকে এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রতিরোধ জিইয়ে রাখে। রাশিয়ান সাম্রাজ্য পুনর্প্রতিষ্ঠা করতে হলে পুতিনের প্রয়োজন তুলনামূলক রক্তপাতহীন বিজয়। রক্তপাতহীন বিজয়ই রাশিয়াকে অপেক্ষাকৃত ঘৃণাহীন দখল এনে দিতে পারে। ইউক্রেনের মানুষের আরও আরও রক্ত ঝরিয়ে পুতিন এটি নিশ্চিত করছেন যে তার স্বপ্ন কখনওই বাস্তবায়ন হবে না। রুশ সাম্রাজ্যের মৃত্যুসনদে মিখাইল গর্বাচেভের নয়, লেখা থাকবে পুতিনের নাম। গর্বাচেভ রাশিয়া ও ইউক্রেনের মানুষদের মধ্যে সহোদরসুলভ সম্পর্ক রেখে গিয়েছিলেন; পুতিন তাদের শত্রুতে পরিণত করেছেন এবং এরই মধ্যে নিশ্চিত করে ফেলেছেন যে ইউক্রেনের মানুষ এখন থেকে রাশিয়াকে প্রতিপক্ষ হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করবে।

শেষ পর্যন্ত জাতিসত্ত্বা গড়ে ওঠে কিংবদন্তীর ওপর। প্রতিদিন ইউক্রেনীয়দের ঝুলিতে অনেক গল্প যুক্ত হচ্ছে যেগুলো তারা শুধু সামনের অন্ধকার দিনগুলোতেই নয়, অনেক অনাগত দশক, প্রজন্ম ধরে বলবে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট রাজধানী থেকে পালাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছেন তার অস্ত্রের প্রয়োজন, পালানোর জন্য বিমান নয়। স্ন্যাক আইল্যান্ডে ইউক্রেনের সৈন্যরা রুশ যুদ্ধজাহাজের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলছে, ‘যাও, নিজেদের গো য়া নিজেরা মারো’। ইউক্রেনের নাগরিকরা রাস্তায় বসে পড়ে রুশ ট্যাংক থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এসব থেকেই জাতি গড়ে ওঠে। দীর্ঘমেয়াদে ট্যাংকের চেয়ে এসব গল্পগাথাই গুরুত্ব পায়।

অন্য সবার মতো রুশ স্বৈরশাসকেরও এটি ভালো করে জানা থাকা উচিত। জার্মান নৃশংসতা আর লেনিনগ্রাদ অবরোধে রুশ সাহসিকতার গল্প শুনেই তিনি শৈশব থেকে বেড়ে উঠেছেন। এখন তিনি একই ধরনের গল্পের জন্ম দিচ্ছেন কিন্তু নিজেকে দাঁড় করাচ্ছেন হিটলারের ভূমিকায়।

ইউক্রেনীয়দের সাহসিকতার গল্প শুধু তাদের নিজেদের নয়, সারা বিশ্বকেও মনোবল যুগাচ্ছে । ইউরোপের দেশগুলোর সরকারকে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে, এমনকি রাশিয়ার নিপীড়িত মানুষকেও সাহস যুগাচ্ছে। ইউক্রেনিয়ার মানুষ খালি হাতে ট্যাংক থামিয়ে দেয়ার সাহস দেখাতে পারলে জার্মান সরকার তাদের কিছু অ্যান্টি-মিসাইল ট্যাংক দেওয়ার সাহস দেখাতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার রাশিয়াকে সুইফট থেকে বাদ দেওয়ার সাহস দেখাতে পারে, রাশিয়ার জনগণও তাদের অর্থহীন যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করার সাহস দেখাতে পারে।

আমরা সবাই কিছু না কিছু করার সাহস দেখাতে অনুপ্রাণিত হতে পারি; সেটি হতে পারে দান, হতে পারে শরণার্থীদের আশ্রয়দান, অনলাইনে যুদ্ধও হতে পারে। ইউক্রেনে যুদ্ধ সারা বিশ্বের ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে। নিগ্রহ ও আগ্রাসনের জয় হলে আমরা সকলেই এর পরিণতি ভোগ করবো। শুধু দর্শক হয়ে থাকার কোনো মানে নেই। উঠে দাঁড়ানোর এবং ধর্তব্যের মধ্যে পড়ার এখনই সময়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। বিভিন্ন রূপে এটি আরও বেশ কয়েক বছর চলতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। গত কয়েক দিনে সারাবিশ্বের কাছে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে ইউক্রেন একটি সত্যিকারের দেশ এবং ইউক্রেনীয়রা সত্যিকার জাতি এবং তারা একটি নতুন রুশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকতে চায় না। এখন মূল যে প্রশ্নটি উন্মুক্ত থেকে গেছে সেটি হলো এ বার্তা ক্রেমলিনের পুরু দেয়াল ভেদ করতে কতটা সময় নেয়।

ইউভাল নোয়াহ হারারি (জন্ম ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬) ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ এবং হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়, জেরুজালেমের ইতিহাস বিভাগের পূর্ণকালীন অধ্যাপক। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে বহুলবিক্রিত বই স্যাপিয়েন্স: অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অব হিউমানকাইন্ড (২০১৪), হোমো ডিউস: অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অব টুমোরো (২০১৬) এবং টুয়েন্টিওয়ান লেসন্স ফর দ্য টুয়েন্টিফাস্ট সেঞ্চুরি (২০১৮)-এর লেখক।

মূল: ইউভাল নোয়াহ হারারি,
অনুবাদ: হারুন আল নাসিফ

মূল প্রবন্ধটি ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ‘দ্য গার্ডিয়ানে’ প্রকাশিত।

Previous articleবাঁশখালীতে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ করার হামলায় আহত ১২
Next articleলামায় স্ত্রীর নির্যাতনে স্বামীর বিষপানে আত্মহত্যা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here